মধ্যপ্রাচ্যে মহাযুদ্ধের দামামা: ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বিভক্ত আমেরিকা, বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 02 Mar, 2026
ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বাহিনীর ভয়াবহ বিমান হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ
নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক প্রলয়ঙ্কারী
যুদ্ধ শুরু হয়েছে।
এই অভিযানের ফলে একদিকে যেমন ইরানের কয়েক দশকের
ক্ষমতা কাঠামো তছনছ হয়ে গেছে, অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে
চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
তবে খামেনি হত্যার মতো বড় সাফল্যের দাবি করলেও নিজ দেশে তীব্র জনরোষ ও অনাস্থার মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
রয়টার্স/ইপসোসের
সর্বশেষ জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রতি চারজন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে মাত্র
একজন (২৭ শতাংশ) এই হামলাকে সমর্থন করেছেন। বিপরীতে ৪৩ শতাংশ নাগরিক এই
অভিযানের ঘোর বিরোধিতা করছেন।
জরিপে দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ মার্কিনি
মনে করেন ট্রাম্প সামরিক শক্তি ব্যবহারে 'অতি উৎসাহী'। এমনকি রিপাবলিকান
পার্টির ২৩ শতাংশ সমর্থকও প্রেসিডেন্টের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে শঙ্কিত।
ডেমোক্র্যাটরা
একে ট্রাম্পের 'ইচ্ছাধীন যুদ্ধ' (War of Choice) বলে আখ্যা দিয়েছেন।
পেন্টাগন সূত্র জানিয়েছে, ইরান আগে হামলা করতে পারে—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট
গোয়েন্দা তথ্য ছাড়াই ট্রাম্প এই অভিযানের নির্দেশ দেন।
রণক্ষেত্র এখন লেবানন: হিজবুল্লাহর পাল্টা আঘাত
খামেনি
হত্যার প্রতিশোধ নিতে সোমবার ভোররাত থেকে ইসরায়েলে মুহুর্মুহু মিসাইল ও
ড্রোন হামলা শুরু করেছে ইরানপন্থী গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। এর জবাবে ইসরায়েলি
বিমানবাহিনী লেবাননের রাজধানী বৈরুতসহ দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননে স্মরণকালের
ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। বৈরুতের আকাশ এখন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, হাজার হাজার মানুষ
ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন। ইসরায়েল সতর্ক করেছে যে, হিজবুল্লাহর এই তৎপরতার
জন্য তারা 'পুরো দায়ী' থাকবে।
প্রথম মার্কিন প্রাণহানি ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঝুঁকি
সংঘাত
শুরুর দ্বিতীয় দিনে কুয়েতের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ৩ মার্কিন সেনা নিহত এবং ৫
জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ট্রাম্প নিহতদের 'দেশপ্রেমিক' বললেও স্বীকার করেছেন
যে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী
নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে সংকটে
ফেলেছে। ভোটারদের বড় অংশই মনে করেন, যুদ্ধের চেয়ে অর্থনীতি ও তেলের দাম
নিয়ন্ত্রণ করা বেশি জরুরি ছিল।
বিশ্ব অর্থনীতিতে 'তেল শক' ও শেয়ারবাজারে ধস
যুদ্ধের
প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক লাফে ৪.৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৭৬
ডলার ছাড়িয়েছে, যা সাময়িকভাবে ৮২ ডলারেও পৌঁছেছিল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী
দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
স্টক মার্কেট: জাপানের নিক্কেই ১.৪% এবং ইউরোপীয় বাজারগুলো ১.৩% এর বেশি পতনের মুখ দেখেছে।
বিমানের
টিকিট: মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ ও দুবাইয়ের মতো ব্যস্ত বিমানবন্দর বন্ধ থাকায়
বৈশ্বিক বিমান চলাচল ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
স্বর্ণের দাম: নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দাম ১% বেড়ে আউন্স প্রতি ৫,৩২৭ ডলারে পৌঁছেছে।
ইরানের ভবিষ্যৎ ও ট্রাম্পের হুমকি
আয়াতুল্লাহ
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে এক বিশাল নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল
সাময়িকভাবে দায়িত্ব নিয়েছে। ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানি সেনাবাহিনী ও
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) আত্মসমর্পণ করার ট্রাম্প আলটিমেটাম
দিয়েছেন এবং ইরানি জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের মতে, এই অভিযান আরও চার সপ্তাহ চলতে পারে।
এক নজরে বর্তমান পরিস্থিতি:
মূল নিহতর খবর: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
মার্কিন ক্যাজুয়ালটি: ৩ সেনা নিহত, ৫ জন গুরুতর আহত (কুয়েত ঘাঁটি)।
অর্থনৈতিক প্রভাব: তেলের দাম বৃদ্ধি (>৪.৫%), শেয়ারবাজারে ধস।
সামরিক লক্ষ্যবস্তু: ১,০০০-এর বেশি ইরানি স্থাপনা ও ৯টি নৌ-জাহাজ ধ্বংস।
জনমত (যুক্তরাষ্ট্র): মাত্র ২৭% সমর্থন, ৪৩% বিরোধিতা।
বিশ্লেষকদের
মতে, খামেনি পরবর্তী ইরান হয়তো সাময়িকভাবে দুর্বল হয়েছে, কিন্তু
হিজবুল্লাহ ও অন্যান্য প্রক্সি গোষ্ঠীর মাধ্যমে তারা যে পাল্টা আঘাত শুরু
করেছে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও অনিশ্চিত সংঘাতের সূচনা হলো।
ট্রাম্পের এই "রণহুঙ্কার" শেষ পর্যন্ত বিশ্ব শান্তি ও মার্কিন অর্থনীতিকে
কোথায় নিয়ে ঠেকায়, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

